অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায়ও সুদহার কমাতে ফেডের ওপর চাপ বাড়াচ্ছেন ট্রাম্প

ফেড চেয়ারম্যানকে প্রতিস্থাপনের হুমকি

শুল্কনীতির চাপ মার্কিন অর্থনীতিতে। সংকুচিত ভোক্তাব্যয়। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে যাওয়ার শঙ্কা।

শুল্কনীতির চাপ মার্কিন অর্থনীতিতে। সংকুচিত ভোক্তাব্যয়। বাড়ছে মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে চলে যাওয়ার শঙ্কা। এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমিয়ে আনতে ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ সুদহার না কমালে ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলকে প্রতিস্থাপন করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন তিনি। যদিও তার এ চাপের মুখে নতি স্বীকার করবেন না বলে জানিয়েছেন জেরোম পাওয়েল। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত নিজেদের মেয়াদ পূরণ করে যেতে চান তিনি।

মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অন্যান্য সূচককে সহনীয় মাত্রায় রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে ফেডারেল রিজার্ভ। এ নিয়ে শুক্রবার আরেক দফা ক্ষোভ উগরে দিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সুদহার ১ শতাংশ কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, এমন একজন নতুন ফেড চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন, যিনি সুদহার কমাবেন।

এ সময় ফেড চেয়ার জেরোম পাওয়েলকে ‘একগুঁয়ে’ বলে অভিহিত করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এও বলেন, ‘তিনি যদি পদত্যাগ করতে চান, আমি খুব খুশি হব।’

ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ফেডের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনিই আসবেন, যিনি সুদহার কমাবেন। যদি সুদহার যেখানে আছে সেখানেই রাখতে চান, তবে আমি তাকে নিয়োগ দেব না।’

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ মন্তব্য মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধানের প্রতি নজিরবিহীন আক্রমণের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় দীর্ঘদিন মার্কিন সুদহার উচ্চ স্তরে আটকে ছিল। এরপর ২০২৪ সালে শুরু হয় সুদহারে কাটছাঁট। তবে গত ডিসেম্বরে নির্ধারণের পর সুদহার ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে ফেড। ওই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে যাচ্ছেন ট্রাম্প।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য হলো, এ মুহূর্তে ১ শতাংশ সুদহার কমানো উচিত। তিনি প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত নয় মাসের বেশি মেয়াদের কোনো ঋণ ইস্যু না করে। যদিও মার্কিন অর্থ বিভাগ আগামী দুই সপ্তাহে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড বিক্রি করতে যাচ্ছে।

ট্রাম্প আগেই জানিয়েছেন, তার কাছে পরবর্তী ফেড চেয়ারম্যান হতে পারে এমন ‘তিন-চারজনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা’ আছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জেরোম পাওয়েলের ওপর ট্রাম্পের চাপ মার্কিন আর্থিক খাতে এমন আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে যে তিনি এমন একজন ‘ছায়া চেয়ার’ নিয়োগ দিতে পারেন, যিনি দ্রুত হারে সুদ কমাতে একমত হবেন।

তবে অনেকে মনে করেন, ‘ছায়া চেয়ার’ কৌশলটি উল্টো ফল দিতে পারে। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রবার্ট বারবেরা বলেন, ‘যদিও চালাকিপূর্ণ পরিকল্পনার মতো শোনায়। তবে বাস্তবে এটি কার্যকর নয়। কারণ ফেড কোনো রাজতন্ত্র নয়।’

১৮ সদস্যবিশিষ্ট ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির একজন ফেড চেয়ার। এখানে চেয়ার ছাড়াও আরো ১১ জনের ভোটাধিকার রয়েছে। ফলে সুদহার কমানো একক কোনো বিষয় নয়। জেরোম পাওয়েলের সাবেক উপদেষ্টা জন ফস্ট বলেন, ‘নিয়মানুসারে যে ক্ষমতা নেই নতুন চেয়ার যদি তেমন শক্তি প্রয়োগ করতে চান, তা মূলত তিনি কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবেন। ফলে চেয়ারে বসে তার প্রভাব কমে যাবে।’

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ির মতো দীর্ঘস্থায়ী পণ্যে ব্যয় ১ দশমিক ৮ শতাংশ কমে সামগ্রিকভাবে ভোগ্যপণ্য খাতে ব্যয় দশমিক ৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। জ্বালানি ও খাবারের মতো পণ্যে ব্যয়ও কমেছে। পরিষেবা খাতে ব্যয় দশমিক ১ শতাংশ বাড়লেও এটি ২০২০ সালের নভেম্বরের পর সবচেয়ে ধীরগতি।

যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসে ভোক্তাব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের আগেই গাড়িসহ পণ্যের কেনাকাটা বেড়েছিল, তার প্রভাব এখন ফিকে হয়ে এসেছে। তবে মাসিক মূল্যস্ফীতির বৃদ্ধি ছিল স্থিতিশীল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি স্বল্পমেয়াদে ফেডের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না। কারণ জেরোম পাওয়েল এরই মধ্যে আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, মূল্যবৃদ্ধির ওপর আমদানি শুল্কের প্রভাব বোঝার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরো সময় প্রয়োজন।

বিভিন্ন ব্যবসায়িক জরিপে জানানো হয়েছে, চলতি গ্রীষ্মে শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বাড়তে পারে, যা জেরোম পাওয়েলসহ বেশির ভাগ অর্থনীতিবিদের পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে যায়। কারণ শুল্কের উচ্চমূল্য এড়াতে আগেই পণ্য আমদানি ও কেনা শুরু করেছিল অনেক প্রতিষ্ঠান ও পরিবার। এতে অর্থনৈতিক চিত্র এখনো অনেকটাই অস্পষ্ট।

বিএমও ক্যাপিটাল মার্কেটসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সাল গুয়াতিয়ারি বলেন, ‘প্রতিবেদনটি ফেডের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আনবে না। মে মাসে ব্যয় হ্রাস আংশিকভাবে আগাম কেনার প্রতিফলন। আর মূল দামের সামান্য বৃদ্ধি শুল্কের প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সাহায্য করে না।’

গত মাসে ভোক্তাব্যয় ছিল যা মার্কিন অর্থনৈতিক কার্যকলাপের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি, যা দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এপ্রিলেও ভোক্তাব্যয় দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছিল। এটি ২০২৫ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ব্যয় হ্রাসের ঘটনা।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুসারে, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা আস্থা ডিসেম্বরের সর্বোচ্চ স্তরের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ কম। ডিসেম্বরের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পরবর্তী অর্থনৈতিক আশাবাদ বেড়েছিল। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, ‘ভোক্তা দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক ধীরগতি ও ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

এদিকে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এখনো অনেক ব্যবসা পুরনো মজুদ বিক্রি করছে বলে দাম বাড়েনি। তবে জুন থেকে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। তবে কিছু অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘‌দুর্বল চাহিদা থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো শুল্কজনিত ব্যয় ভোক্তাদের ওপর চাপাতে পারবে না।’

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গত সপ্তাহে সর্বশেষ বৈঠকে সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে ফেড। বিশ্লেষকরা আশা করছেন, সেপ্টেম্বরে সুদহার কমানো হতে পারে।

আরও